আগামী ০৮ মে অনুষ্ঠিতব্য বন্দর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে আটঘাট বেধে মাঠে নেমেছে দুর্ধর্ষ রাজাকার পরিবারের সন্তান মাকসুদ হোসেন। মুছাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান থাকাকালীণ সময়ে মানুষের জমি দখল, মাদক ব্যবসার শেল্টার দেয়াসহ নানা অবৈধ উপায়ে কাড়ি কাড়ি অর্থ পকেটে পুড়ে, এখন সেই অর্থ বিলিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান হওয়ার মিশনে নেমেছে এই কুখ্যাত রাজাকার পরিবারের সন্তান মাকসুদ।
ইতিহাসবিদ মুনতাসির মামুনের বই ‘শান্তি কমিটি ১৯৭১’ রাজাকারের তালিকায় মাকসুদের বাবা রফিক, দাদা মাইনুদ্দিন, চাচা আব্দুল মালেক ও আরেক চাচা সামাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। রাজাকার রফিকের জীবদ্দশায় পূর্ব পাকিস্তান থেকে স্বাধীণতার দিন পর্যন্ত মাকসুদের বাবা রাজাকার রফিক, দুই চাচা ও দাদার হাতে বেশ কয়েকটি খুনের ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া, যুদ্ধকালীণ সময়ে অগ্নিসংযোগ করে ১২ জনকে হত্যা করা, হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি রাজাকার রফিক গংদের অত্যাচারের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের সকল মুক্তিযোদ্ধা ও অনেক জনপ্রতিনিধি প্রায়ই রাজাকার পরিবারের সন্তান মাকসুদের বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকান্ডের বিরোধীতা করে থাকেন। সম্প্রতি, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য একেএম সেলিম ওসমান বলেছেন, মাকসুদ যে রাজাকার পরিবারের সন্তান সে নিজেই তার প্রমাণ দিয়েছে। এর আগে, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী এক অনুষ্ঠানে মুছাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাকসুদ হোসেনকে সরাসরি রাজাকারের ছেলে বলে উল্লেখ করেছিলেন। মেয়রের এই বক্তব্যের পর বন্দর তথা নারায়ণগঞ্জের সর্বত্র তোলপাড় সৃষ্টি হয়।
এলাকাবাসী ও মুক্তিযোদ্ধাদের মতে, বন্দরের মুছাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মাকসুদ হোসেনের বাবা অবিভক্ত ধামগড় ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান এমএ রফিক ছিলেন দুর্ধর্ষ রাজাকার। তবে এ বিষয়টি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসভিত্তিক বই এবং গবেষনাগ্রন্থে থাকলেও নতুন প্রজন্মের কাছে অনেকটাই অজানা ছিল। তবে, দিন দিন চাপা পড়ে থাকা সেই ইতিহাস সাধারণ মানুষের কাছে নতুনভাবে উন্মোচিত হচ্ছে। এই রাজাকার পুত্র যাতে কোনোভাবেই উপজেলার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিষদের চেয়ারম্যান হতে না পারে সেই প্রত্যাশা করেন তারা।
এ বিষয়ে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার এড. নুরুল হুদা বলেন, ‘রফিক চেয়ারম্যান, তার বাবা ও দুই ভাই মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকারের ভূমিকা পালন করেছেন। তারা বন্দরে পাক বাহিনীর সাথে হাত মিলিয়ে নানা অপকর্ম চালিয়েছিলেন।’
জানা গেছে, স্বাধীনতার পরও ধামগড় ইউনিয়নে এই রাজাকার ও তাদের পরিবারের লোকজনদের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড অব্যাহত ছিল। তাদের এই দুর্ধর্ষ কর্মকান্ড নিয়ে ২০০১ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি দৈনিক জনকন্ঠ ‘নারায়ণগঞ্জ ৩০ বছরেও রফিক বাহিনীর সন্ত্রাস কমেনি। ধামগড়ের মানুষ আতঙ্কিত’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রকাশিত প্রতিবেদনটি হুবুহু তুলে ধরা হলোÑ
দৈনিক জনকন্ঠের প্রতিবেদন: ৩০ বছর আগে স্বাধীন হয়েছে দেশ। কিন্তু এখনও আধিপত্য কমেনি বন্দর থানার ধামগড় এলাকার কুখ্যাত রাজাকার রফিক চেয়ারম্যানের। তার বাহিনীর ভয়ে এখনও আতঙ্ক দিন কাটাচ্ছে মানুষ। মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে অসংখ্য নৃশংস হত্যাকান্ডের হোতা এই রফিক রাজাকারের নেতৃত্বে তার সন্ত্রাসী ছেলেরা ঘটিয়ে যাচ্ছে একের পর এক হত্যাকান্ড। রাজাকারের ছেলে বলার অপরাধে কয়েক বছর আগে বন্দর থানার কুঁড়িপাড়া বাজারে কুপিয়ে হত্যা করা হয় মুক্তিযোদ্ধা আলাউদ্দিনকে। এখনও ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, অপহরণ এমন কোন অপকর্ম নেই যা করছে না তার সন্ত্রাসী ছেলেরা। সন্ত্রাসী ছেলেদের নেতৃত্বে রয়েছে এই ঘৃণিত রাজাকার। রাজাকার রফিক বাহিনীর আতঙ্কে এখনও দিন কাটায় ধামগড় ইউনিয়নের মানুষ। তার ছেলেরা যা খুশি তা-ই করে। ভয়ে টু শব্দ করে না মানুষ। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বন্দর থানার ধামগড় ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিল এমএ রফিক। সে হাত মিলায় পাকহানাদার বাহিনীর সাথে। স্থানীয় শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান হয়। মেতে ওঠে হত্যার উৎসবে। এলাকাবাসী জানিয়েছে, ১৪ এপ্রিল ’৭১ একদিনেই তার নেতৃত্বে হত্যা করা হয় এলাকার ৪ নিরীহ লোককে। তার হাতে ঐদিন নৃশংসভাবে খুন হয় ধামগড় গ্রামের বাসিন্দা গিয়াসউদ্দিন, আমিন উদ্দিন, মতি মিয়া ও আ. হামিদ। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এই ঘৃণিত রাজাকারের বাহিনী আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় ১৩টি গ্রাম। ১৪ ডিসেম্বর ’৭১ রাজাকার রফিকের বাহিনী গুলি করে হত্যা করে ধামগড় গ্রামের নূর ইসলাম, নয়ামাটি গ্রামের আবদুল হামিদ, ইদ্রিস আলী, লালখারবাগ গ্রামের ইদ্রিস আলী, কুটিরবন্ধ গ্রামের আবুল হাশেম, মোছেরছড়া গ্রামের জলিল মিয়া ও হরিপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল আজিজকে। পিস কমিটির চেয়ারম্যান রফিকের নেতৃত্বে ছালামত, খালেক, মিন্নত আলী, আবদুস সালাম, গোলাম মাওলা, আলী হোসেন প্রমুখের সমন্বয়ে গঠিত রাজাকার বাহিনী তান্ডব চালায় ধামগড় ইউনিয়নে। এখনও অনেকে এই ঘৃণিত রাজাকার বাহিনীর নৃশংসতার স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছে। স্বাধীনতার পর ভোল পাল্টায় রাজাকার রফিক। কিছুদিন আত্মগোপনের পর আবার ফিরে আসে এলাকায়, আবির্ভূত হয় স্বরূপে। গড়ে তোলে বিশাল সন্ত্রাসী বাহিনী। ছলে বলে কৌশলে নির্বাচিত হয় ধামগড় ইউপি চেয়ারম্যান। আবার অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে এই কুখ্যাত রাজাকার। কয়েক বছর আগে রাজাকার রফিকের সন্ত্রাসীরা কুড়িপাড়া বাজারে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে মুক্তিযোদ্ধা আলাউদ্দিনকে। আলাউদ্দিনের অপরাধ, তিনি রফিকের ছেলেকে বলেছিলেন- ‘রাজাকারের ছেলে’। এই নৃশংস হত্যাকা- চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে বন্দরে। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ বন্দর কমান্ড মুক্তিযোদ্ধা আলাউদ্দিনের হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন, মিছিল-মিটিং পর্যন্ত করে। আইনের ফাক গলে বেরিয়ে আসে রাজাকার রফিক ও তার সন্ত্রাসীরা। রাজাকার রফিক বিয়ে করেছে ৪টি। ৪ পক্ষে তার ছেলে রয়েছে ৮ জন। প্রায় সবাই চিহ্নিত সন্ত্রাসী। রাজাকার রফিকের দ্বিতীয় স্ত্রীর বড় ছেলে আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে বন্দর থানায় হত্যা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, অপহরণ, অবৈধ অস্ত্র রাখা প্রভৃতি অপরাধে ৮টি মামলা রয়েছ। গত ৮ ফেব্রুয়ারি পুলিশ গ্রেফতার করে র্দুর্ধষ এই সন্ত্রাসীকে। বন্দর থানা-পুলিশ জানিয়েছে, এর আগেও তাকে অনেকবার গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রতিবারই জামিনে বেরিয়ে এসে এলাকায় কায়েম করে ত্রাসের রাজত্ব। দ্বিতীয় স্ত্রীর তৃতীয় ছেলে মুর্শেদ ওরফে মুন্সীও র্দুর্ধষ সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে অসংখা মামলা রয়েছে বন্দর থানায়। চতুর্থ ছেলে মোয়াজ্জম ওরফে কালুর বিরুদ্ধে রয়েছে ২ হত্যাসহ ৯টি মামলা। এলাকাবাসী জানিয়েছে, রাজাকার রফিকের অন্যান্য ছেলেও সন্ত্রাসী। তাদের ভয়ে আতঙ্কে দিন কাটায় এলাকার মানুষ। মানুষের জমিজমা দখল করে এখন অগাধ সম্পত্তির মালিক রাজাকার রফিক। স্থানীয় মিলকারখানায় একচ্ছত্র আধিপতা। এসব মিলকারখানায় ঠিকাদারি, ব্যবসাবাণিজ্য সবকিছুই পরিচালিত হয় তার ইচ্ছায়। দুঃখজনক হলেও সত্য, কিছু নীতিভ্রষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ব্যবসায়িক সুবিধা নেয়ার জন্য পরিণত হয়েছে এই ঘূণিত রাজাকারের চাটুকারে। এই রিপোর্টে যা তুলে ধরা হয়েছে, তা কুখ্যাত রাজাকার রফিকের অপকীর্তির সামান্য অংশমাত্র। দেশ ৩০ বছর আগে স্বাধীন হয়েছে কিন্তু এখনও এই কুখ্যাত রাজাকারের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে ভয় পায় মানুষ।
© স্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক স্বাধীন বাংলাদেশ