মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) এসিল্যান্ড অফিসের সহকারী মো. ইমন হোসেন ও গাড়িচালক আল-আমিনের অনিয়ম-দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী ও উপজেলার সচেতন নাগরিক সমাজের ব্যানারে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছে স্থানীয়রা। আজ মঙ্গলবার (০৭ এপ্রিল) বেলা সাড়ে ১১ টার দিকে উপজেলা ভূমি অফিসের সামনে মাওয়া-লৌহজং-বালিগাঁও সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভকারীরা। এ সময় সড়কে প্রায় ৩০ মিনিট যান চলাচল বন্ধ থাকে। বিক্ষোভকারীরা ইমন ও আল-আমিনকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে অপসারণের আল্টিমেটাম দিয়েছে। এ সময়ের মধ্যে এ দুজনকে অপসারণ করা না হলে এসিল্যান্ড অফিস ঘেরাওয়ের ঘোষণা দিয়েছে তারা।
বিক্ষোভকারীরা জানান, ভূমি অফিসের সহকারী (উমেদার) মো. ইমন হোসেন এসিল্যান্ডের কথা বলে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে চাঁদা দাবি করে আসছে। কাগজে ভুলত্রুটির কথা বলে মোটা অংকের টাকা আদায় করা হয়। টাকা দিতে সম্মত না হলে কিংবা অসমর্থ হলে মাসের পর মাস ঘুরানো হয়। এ ছাড়া ইমন মোটরসাইকেল নিয়ে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ায়। কেউ ভূমি অফিসের অনুমতি ছাড়া জমি ভরাট করলে সেখানে গিয়ে হাজির হয় ইমন।
এসিল্যান্ড ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের ভয়ভীতি দেখিয়ে ভরাটকারীদের কাছ থেকে ইমন বিনা রশিদে বিপুল অর্থ আদায় করে থাকে। ৬ হাজার টাকা বেতনে গত ৪ বছরে সে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের মালিক বনে গেছে। নিজবাড়িতে সে প্রায় ৩০ লাখ টাকা মূল্যের দুটি টিনকাঠের দোতলা ঘর তুলেছে। এমনকি কোটি টাকা ব্যয়ে বহুতল পাকা ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে একতলা ভবন নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। এ ছাড়া নরসিংদী জেলার মনোহরদী উপজেলার নরেন্দ্রপুর মৌজার ১০৪২ নম্বর খতিয়ানের ১৬৬১ দাগের ৮ দশমিক ৬২ শতাংশ জমি ক্রয় করেছে। যার আনুমানিক মূল্য ১৫ লাখ টাকা। উমেদার হয়ে এসিল্যান্ডের বদান্যতায় ইমন ঘোড়দৌড় বাজারে খাস জমি বরাদ্দ পেয়েছে। বিক্ষোভকারীরা প্রশ্ন তোলেন, একজন উমেদার ৬ হাজার টাকা বেতনে ৪ বছরে কিভাবে কোটি টাকার মালিক হলো।
এ ছাড়া বিক্ষোভকারীরা গাড়িচালক আল-আমিনের বিষয়েও বিস্তর অভিযোগ করেন। এর মধ্যে সম্প্রতি আল-আমিন এসিল্যান্ডের কথা বলে এক বৈধ বালু ব্যবসায়ীর কাছে ৬ লাখ টাকা দাবি করেন। আল-আমিন এসিল্যান্ডকে ম্যানেজ করে ঘোড়দৌড় বাজারে চারটি ভিটি বরাদ্দ নিয়েছে। চার ভিটি থেকে আল-আমিন প্রতিমাসে ১৫ হাজার টাকা ভাড়া আদায় করে আসছে। এ ছাড়া সে বেজগাঁও ইউনিয়নের ভোগদিয়া মৌজায় তাঁর মা ও বোনের নামে প্রায় ২০ শতাংশ খাসজমি বন্দোবস্ত নিয়েছে। জমির মূল্য প্রায় ৭০ লাখ টাকা। এ জমি কৌশলে বিক্রির পাঁয়তারা করছে আল-আমিন।
বিক্ষোভকারীদের মধ্যে ভুক্তভোগী ইজারাকৃত বালু ব্যবসায়ী অরুণ মাঝি, ইট-বালু ব্যবসায়ী জসীম মোড়ল, পিঁয়াজ ব্যবসায়ী মোখলেস মিয়া, গৃহবধূ পিয়ারা বেগম প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। অরুণ মাঝি বলেন, আমি একজন বৈধ বালু ব্যবসায়ী। আমার কাছে ইমন ও আল-আমিন এসিল্যান্ডের কথা বলে ৬ লাখ টাকা দাবি করে। জসীম মোড়ল বলেন, ইমন এসিল্যান্ডের নাম করে আমার দুটি মাহেন্দ্র চালানোর দায়ে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করে। এর ফলে বিরক্ত হয়ে আমি মাহেন্দ্র দুটি বিক্রি করে দিই। মাসুদ বলেন এসিল্যান্ড আমাদের ও আরেকটি বালিগাঁও এর মালিক দুইটি মাহেন্দ্রা বালিগাঁও থেকে তেল নিয়ে আসার পথে পূর্ব বুইড়দা এলাকা থেকে মোবাইল কোর্ট করে আমাদের ও বালিগাঁও এর মালিক আরেকটা মাহেন্দ্রা গাড়ি রাস্তা থেকে আটক করে উপজেলা মাঠে নিয়ে যায়৷ তখন এসিল্যান্ড অফিসে যোগাযোগ করলে তারা বলে ইউএনও অফিসে যেতে ইউএনও স্যারের সাথে কথা বললে তিনি বলেন এসিল্যান্ড গাড়ি আটক করেছে তার সাথে যোগাযোগ করতে। তখন এসিল্যান্ড স্যারের সাথে কথা বললে বলে ইমনের সাথে কথা বলতে।পরে ইমনের সাথে মধ্যস্থতা হয়। ইমন ভাই বলেন স্যার জরিমানা করলে ৫০ হাজার থেকে ১০ লাখ টাকার মধ্যে করবে। অনেক রিকুয়েষ্টের পর আমাদেরটা ২৫ হাজার টাকায় দফারফা হয়৷ টাকা দেওয়ার পর রশিদ চাইলে ইমন বলে রশিদে জরিমানা করলে মিনিমাম ৫০ হাজার টাকা লিখতে হবে তারপর আরো খরচ আছে৷ রশিদ লাগবে না৷
এরপর আমাদের গাড়ির তেলের টাংকি থেকে ৩০ লিটার তেল নিয়ে গেছে। পিয়ারা বেগম বলেন, নভেম্বরে জমির নামজারির জন্য আবেদন করেছি। প্রতি সপ্তাহে অফিসে এলেও কাজ হচ্ছে না। ইমন এসিল্যান্ডের কথা বলে ২০ হাজার টাকা দাবি করেছে। আমার স্বামী অটোরিকশা চালায়, আমি এত টাকা কোথায় পাবো?
আরেক ভুক্তভোগী শাহ জাহান জানান, তার চাচা বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সোলাইমান ১৯৬৩ সালে কাজিরপাগলা মৌজায় ২৭৮ শতাংশ জমি স্থায়ী বন্দবস্ত পান। ২০২৪ সাল পর্যন্ত খাজনা পরিশোধ করেছেন। পরে সে জমি নবায়ন করতে আসলে বর্তমান এসিল্যান্ড জমির বিষয়ে ইমন ও আল আমীনের সাথে কথা বলতে বলেন। পরে ইমন ও আল আমীন ৫০ লাখ টাকা দাবি করে। কিন্তু আমরা তাদের ৫০ লাখ টাকা না দেওয়ায় আমাদের সে জমিটি আওয়ামী লীগ আমলের মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান রিনা ইসলাম ৩০ শতাংশ জমি, হাসেম ফকির, শহিদুল্লাহ্, মজিবুর, সুলতান খান, আহমদুল্লাহ্কে টাকার বিনিময়ে প্রায় ২৫০ শতাংশ জমি লিজ দেয়। অথবা দীর্ঘ ৫০টি বছরের বেশি সরকারের সকল নিয়ম মেনে চলে আসছি। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার জমি কিভাবে টাকার বিনিময়ে অন্যকে দিয়ে দিলো। এ দুর্নীতি বাজ এসিল্যান্ডকে দ্রুত অপসারণ করতে হবে। সে সাথে তার সহচারী ইমন ও আল আমীনকেও শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
অভিযুক্ত ইমন মুঠোফোনে জানান, তার বিরুদ্ধে সব অভিযোগ মিথ্যা। আমার বড়ো ভাই বিদেশে থাকে। তাদের টাকায় দোতলা ঘর ও বিল্ডিং বানানো হয়েছে। জমি থাকলে তদন্ত করে দেখুক৷
এদিকে আল-আমিন জানায়, আমার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট। অনৈতিক দাবি মেনে না নেওয়ায় বালু ব্যবসায়ীরা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।
অভিযুক্ত ইমন ও আল-আমিনের
বিষয়ে এসিল্যান্ড বাসিত সাত্তার জানান, এদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ আমার বর্তমান কর্মস্থলে যোগদানের আগের। বর্তমানের অভিযোগের বিষয়ে আমি অবগত নই। ##
© স্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক স্বাধীন বাংলাদেশ