১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার ব্রাহ্মণগাঁও বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রদের স্মরণে নির্মিত মুক্তিযোদ্ধা ফলক উন্মোচিত হয়েছে। মঙ্গলবার (১৬ ডিসেম্বর) বিজয় দিবসের দুপুরে বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও মুক্তিযোদ্ধারা ফলকের উন্মোচন করেন।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল থেকে মুক্তি ও স্বাধীনতার যে লড়াই সূচিত হয়েছিল, তাতে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের ছাত্র-যুবকদের মতো মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং উপজেলার ব্রাহ্মণগাঁও বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ও অধ্যয়নরত ছাত্ররাও ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এই মুক্তিযুদ্ধে। প্রাক্তন ছাত্রদের মধ্যে সেসময় অনেকেই ছিলেন চাকরিজীবী, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে অধ্যয়নরত ছাত্র। আর নিজ বিদ্যালয়ে ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন এসএসসি পরীক্ষার্থী থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী স্কুলের প্রাক্তন ও অধ্যয়নরত ছাত্রদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন ১৯৫৬ ব্যাচের মনোয়ার মাহবুবুল আলম, ক্যাপ্টেন এমএ হামিদ (১৯৫৬), মো. শাহজাহান মিয়া (১৯৬২), ঢালী মোয়াজ্জেম হোসেন (১৯৬৩), নূহ-উল-আলম লেনিন (১৯৬৫), এজি ফারুক গণি (১৯৬৬), মাহবুব হোসেন খান (১৯৬৬), হারুন-আর-রশিদ (১৯৬৭), মনোয়ার রফিকুল আলম (১৯৬৭), আমজাদ হোসেন (১৯৬৮), জিএম আইয়ুব (১৯৬৮), ইকবাল হোসেন (১৯৬৯), আবদুর রশিদ আখতার (১৯৬৯), আওলাদ হোসেন (১৯৬৯), মন্টু চন্দ্র ঘোষ (১৯৬৯), শাহজাহান মোড়ল (১৯৭১), মতিউর রহমান (১৯৭২), আওলাদ হোসেন টুকু (১৯৭২), নজরুল ইসলাম বাবুল (১৯৭৪) ও গোলাম হোসেন নকুল (১৯৭৪) প্রমুখ।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. রমজান মাহমুদ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের তথ্য সংগ্রহ ও তালিকা তৈরি করেন। উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডের আহ্বায়ক মুক্তিযোদ্ধা তোফাজ্জল হোসেন ব্রাহ্মণগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ের মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা সঠিক বলে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মুক্তিযুদ্ধে প্রাক্তন ও অধ্যয়নরত ছাত্র মিলিয়ে এই স্কুল থেকে অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা ছিল ৬৩ জন। যেটি ছিল তৎকালীন লৌহজং থানার মধ্যে সর্বোচ্চ। এদের মধ্যে ঢালী মোয়াজ্জেম হোসেন (১৯৬৩) ছিলেন মুক্তিবাহিনীর থানা কমান্ডার ও ইকবাল হোসেন ছিলেন মুজিববাহিনীর থানা কমান্ডার। এই ৬৩ জন মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে সম্মুখ সমরে শহীদ হন ক্যাপ্টেন এম এ হামিদ (১৯৫৬) ও আমজাদ হোসেন (১৯৬৮)। আর সমগ্র ঢাকা জেলায় দুইজন বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্তদের মধ্যে একজন এই স্কুলেরই ছাত্র মতিউর রহমান বীর প্রতীক (১৯৭২)।
ব্রাহ্মণগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ের গৌরব এই ৬৩ জন মুক্তিযোদ্ধার নাম ও ব্যাচসহ দীর্ঘ ৫৪ বছর পর তৈরি করা হয়েছে এই নামফলক। শ্বেতপাথরের ওপর খোদাই করে লেখা এই নামফলকটি তৈরি করা হয়েছে বিদ্যালয়ের ১২৩ বছর পূর্তি উদযাপন কমিটির উদ্যোগে আর বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এটি স্হাপন করেছে শহীদ মিনার চত্বরে। ১৬ ডিসেম্বর মঙ্গলবার মহান বিজয় দিবসে মুক্তিযোদ্ধা ফলকটি আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মোচন করা হয়।
এদিন মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ঢালী মোয়াজ্জেম হোসেন, হারুন-আর-রশিদ, আওলাদ হোসেন, মুনীর মোরশেদসহ বিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ ও স্থানীয় বিশিষ্টজন উপস্থিত ছিলেন।
মুন্সীগঞ্জ জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডের সদ্য সাবেক সদস্য সচিব মুক্তিযোদ্ধা শেখ কামাল হোসেন জানান, জেলায় ব্রাহ্মণগাঁও স্কুলের মতো এত অধিকসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা কোথাও নেই। এছাড়া কোনো বিদ্যালয়ে মুক্তিযোদ্ধা ফলক নির্মাণ এটাই প্রথম। #