রাজনীতির গতি প্রকৃতি আবহাওয়ার মত বদলে যাওয়ার দেশ বাংলাদেশ। যে দেশটি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীন হয়েছিল। যে দেশটিকে গত ২০ বছর ধরে দক্ষ নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন তারই কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দীর্ঘ সংগ্রাম আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে ভারতের সার্বিক সহযোগিতা ও সমর্থন নিয়ে। সে এক বিস্তৃত ইতিহাস। ৩০ লক্ষ শহীদ আর দুই লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে স্বাধীন বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। পরম এই সত্যের উল্টোপিঠে আরো নির্মম আর বেদনার ইতিহাস হলো আমাদের সেনার আত্মধান। পৃথিবীর ইতিহাসে এই একটিমাত্র ইতিহাস যে কোন দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অন্য কোন দেশের সামরিক বাহিনীর সদস্যরা প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধে অংশ নিয়ে জীবন দান করেছেন। বিরল এই ইতিহাস আমাদের বাঙালি জাতির জন্য অত্যন্ত গৌরবের হলেও বাংলাদেশেরই একটি গোষ্ঠী যারা একাত্তরে ছিল স্বাধীনতা বিরোধী এবং নাম লিখিয়েছিল রাজাকার, আল বদর, আল-সামস বাহিনীর সদস্যদের খাতায়। যারা মুক্তিযুদ্ধের সারা নয় মাস পাকিস্তানি বাহিনীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাঙালি জাতির বিরুদ্ধে অস্ত্র তাঁক করেছিল। এবং নিরস্র বাঙ্গালীকে হত্যার খেলায় মেতে উঠেছিল। এরপরও সকল প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে বাংলাদেশ স্বাধীনতার লাল সূর্যকে বুকে ধারণ করে পৃথিবীর মানচিত্রে উদিত হয়।
কিন্তু না। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এক নির্মম অধ্যায় রচনা করে দেশীয় আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীদের দল বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশকে সেই একাত্তরের প্রতিক্রিয়াশীল পরাজিত শক্তি পাকিস্তানি ভাবধারায় বাংলাদেশকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। এই ফিরিয়ে নেয়ার জন্য পাকিস্তান এবং তাদের দোসররা বেছে নেয় একশ্রেণীর কুলাঙ্গার রাজনীতিক এবং সেনা সদস্যকে। যার অগ্রভাগে ছিল তৎকালীন সেনা উপপ্রধান জেনারেল জিয়া। পরবর্তীতে যার নেতৃত্বে গঠিত হয় বিএনপি। আর এই বিএনপির ছায়াতলে সমবেত হয় পাকিস্তানি দালাল রাজাকার ও পরাজিত শক্তি। এই পরাজিত শক্তি আজ বাংলাদেশের মাটিতে মহীরুহু আর দানবীয় কায়দায় মুক্তিযুদ্ধ আর অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে নির্মূল করার নৃশংসতার নামাবলী গায়ে চেপে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। যারই সর্বশেষ নিদর্শন হলো ভারতীয় পণ্য বয়কটের ডাক। যে ভারতের অপরিসীম সহযোগিতায় বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। যাদের সেনাবাহিনীর অসংখ্য শহীদের বিষন্ন বেঁধিতে বাংলার বুক। সে দেশেরই বিরুদ্ধে বিএনপি নামক মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী শক্তি মাঠে নেমেছে। ছি!সামান্যতম লজ্জাবোধ থাকলে বিএনপি এটা করতে পারতো। যে বিএনপির নেতারা ক্ষমতায় যেতে ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনীতিকের দুয়ারে ভিক্ষার থালা হাতে করে ঘুরে বেড়ায়। আর গোপনে গোপনে ভারতের হাইকমিশনে ধর্না দেয় তারাই আবার তাদের চিরাচরিত রাজাকারীয় রূপে ফিরে এসে ভারতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। অথচ এই বাংলাদেশের মানুষের দিন শুরু হয় ভারতীয় ভোগপণ্য ব্যবহারের মধ্য দিয়ে। যার মধ্যে অন্যতম হলো ঘুম থেকে উঠেই ক্লোজআপ, পেপসোডেন্ট, কোলগেট, টুথপেস্টের স্পর্শ নিয়ে দিনের সূচনা। এরপর সারাদিনে আর কত কি যে ভারতীয় পণ্য ব্যবহার করি তার কোন ইয়ত্তা নেই। সেখানে বিএনপি’র এই ঘোষণা কি বালখিল্য কিংবা ভন্ডামি নয়? এক্ষেত্রে একটা কথা বলে নেই। এটা হল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দেশপ্রেম অন্যের কোন অংশেই কম। যদি আজ আমরা সর্বক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ হই তাতে এদেশেরই অর্থনীতি সমৃদ্ধ হবে এবং আমরা গর্ববোধ করবো। কিন্তু সার্বিক পরিস্থিতি সে অবস্থায় নেই। বিশেষ করে চাল, গম, আদা, রসুন, পেঁয়াজ, মসলার জন্য বাংলাদেশ এখনো ভারতের উপর আত্মনির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এই বাস্তবতার নিরিখে বিএনপির চাতুর্যপূর্ণ ভারতীয় পণ্য বয়কটের ডাক চরম হিপোক্রেসিরই নামান্তর।
লেখক: সিনিয়র আইনজীবী
সাধারণ সম্পাদক, নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামিলীগ।
© স্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক স্বাধীন বাংলাদেশ