মানুষ মরণশীল। ‘জন্মিলে মরিতে হইবে’ এ সত্য কেউ অস্বীকার করতে পারে না। কিন্তু এমন কিছু মৃত্যু আছে যা রূপকথাকেও হার মানায়। যেমন আমাদের মেধার মৃত্যু। সবুজ প্রকৃতিকে ভালোবাসতেন পরিবেশ কন্যা মেধা। আর এই সবুজ পরিবেশকে বাঁচানোর জন্য লড়াই করতে করতে নিজেই বৃক্ষচাপায় অকালে প্রাণ হারান সৌমিতা দাশ চৌধুরী (মেধা)। তার এ মৃত্যু রূপকথার মতোই। মেধা আমাদের নারায়ণগঞ্জের মেয়ে। ১৯৯৯ সালে জন্ম । তার মা শুভ্রা দাশ টাঙ্গাইলের মেয়ে। আর বাবা মলয় দাশ চন্দন নারায়ণগঞ্জের ছেলে। আমলাপাড়ায় চন্দনদের নিজ বাড়ি থাকলেও ১৯৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় সপরিবারে মেরে ফেলার ভয় দেখিয়ে কালীর বাজারে তাদের সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাড়িঘর দখল করে নেয় কতিপয় মুখচেনা সমাজপতি। নিজ বাড়ি থেকে সপরিবারে উচ্ছেদ করা হলে তাদেরকে ভাড়াটিয়ার জীবন বেছে নিতে হয়। এখানেই শেষ নয়। ২০০১ সালে প্রাণ বাঁচাতে তাদেরকে সপরিবারে নিজ জন্মভূমিই ত্যাগ করতে হয়। দেশান্তরী হয়ে তারা আশ্রয় নেন কলকাতার বেলঘড়িয়ায়।
কলকাতার যাদবপুর বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রী থাকাকালে মেধা পরিবেশ আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। ২০২২ সালের ১২ ফেব্রæয়ারি সন্ধ্যা ৫.৪০ মিনিটে কলকাতায় পরিবেশ নিয়ে গণসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘গাছের জন্য গান’ শিরোনামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে গান গাইছিলেন মেধা। এসময় হঠাৎ একটা বিশাল আকারের নারকেল গাছ ভেঙ্গে তার মাথায় পড়ে। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং সেখানেই মারা যান। চোখের সামনে এমন অলৌকিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করে উপস্থিত সবাই বাকরুদ্ধ হয়ে মেধার প্রাণহীনদেহ ঘিরে মাতম করতে থাকেন।
২ বছর হলো মেধা নেই। প্রকৃতির ডাকে অনন্তে মিশে গেলেও মেধা আমাদের জন্য রেখে গেছেন তার আরাধ্য কাজ। তার এই কাজকে এগিয়ে নিতে ‘মেধা মঞ্চ’ নারায়ণগঞ্জ শাখা এক সেমিনারের আয়োজন করে। শনিবার বিকেলে আলী আহাম্মদ চুনকা পৌর পাঠাগার ও মিলনায়তনের ৫ম তলায় এক্সপেরিমন্টাল হলে অনুষ্ঠিত সেমিনারের বিষয়বস্তু ছিলো : প্রকৃতির সংরক্ষণে প্রতœ-ঐতিহ্য। সেমিনারের একমাত্র আলোচক ছিলেন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের প্রতœতত্ত¡ বিভাগের অধ্যাপক, এ কে এম শাহনাওয়াজ।
নারায়ণগঞ্জ মেধা মঞ্চের আহŸায়ক মাইনউদ্দিন মানিকের সাবলীল সঞ্চালনায় সেমিনারে সূচনা বক্তব্য রাখেন, মেধার বাবা মলয় দাশ চন্দন। কলকাতা থেকে আসা দু’জন অতিথি ছিলেন, প্রদীপ চৌধুরী এবং সুশান্ত সিনহা তরফদার। নারায়ণগঞ্জ কলেজের অধ্যক্ষ রুমন রেজা তার কলেজের একটি টিম নিয়ে এসেছিলেন। এ ছাড়া বিএম ইউনিয়ন হাইস্কুল, জয়গোবিন্দ হাই স্কুল এবং হেরিটেজ স্কুলের শিক্ষার্থীরাও এসেছিলেন তাদের শিক্ষকদের হাত ধরে। আরো উপস্থিত ছিলেন, ইউসুফ আলী এটম, করীম রেজা, রীনা আহমেদ, ফরিদ আহমেদ রবি, নির্মল দাস, নাসিম আফজাল, হান্নান সরকার, আ.মান্নান, মুহম্মদ সেলিম, ভবানী শংকর রায়, আহদে বাবলু, ওসমান খান, মতিউর রহমান, জহিরুল মিন্টু, রইস মুকুল, রুজভেল্ট, বিলকিস ঝর্ণা প্রমুখ।
সেমিনারে প্রকৃতি, পরিবেশ-প্রতœতত্ত¡ ও মেধাাকে নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা করেন প্রফেসর এ কে এম শাহনাওয়াজ। তিনি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একেবারে পিনপতন নীরবতায় শ্রোতাতাদের মোহাবিষ্ট করে রাখেন। আলোচনার শেষপর্বে ছাত্র ও শ্রোতাদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন জনাব শাহনাওয়াজ।
© স্বত্ব সংরক্ষিত © দৈনিক স্বাধীন বাংলাদেশ