ইসলামে নারীর অবস্থান ও স্বাধীনতা নিয়ে বৈশ্বিক পরিসরে বহুদিন ধরে আলোচনা ও বিশ্লেষণ চলমান। কেউ মনে করেন ইসলাম নারীর স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করেছে, আবার কেউ দাবি করেন ইসলামই প্রথম নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছে। ধর্ম, ইতিহাস, সমাজ ও সংস্কৃতির জটিল বিন্যাসে এই আলোচনা যেন এক বহমান নদী—নানা স্রোত ও ঘূর্ণিতে ভরা; ভুল ব্যাখ্যার পাশাপাশি আছে অনুপ্রেরণাদায়ক উদাহরণও। ইসলামে নারীর অবস্থান অনুধাবনের জন্য ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক রূপান্তর এবং মুসলিম সমাজের সঠিক-ভুল প্রথার ইতিহাস বিবেচনা করা জরুরি।
ইসলামের চূড়ান্ত অধ্যায় শুরুর আগে আরব সমাজে নারীর মর্যাদার জায়গা ছিল না বললেই চলে। কন্যাসন্তানের জন্ম অপমান হিসেবে বিবেচিত হতো; নারীর সম্পত্তির অধিকার ছিল না, এমনকি বৈবাহিক সিদ্ধান্তেও তাদের মতামতের মূল্য ছিল না। এমন প্রেক্ষাপটে ইসলাম এসে নারীর মৌলিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করে। কুরআনের সূরা আন-নিসা’র ১নং আয়াতে এসেছে, “হে মানুষ, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক নফ্স থেকে। আর তা থেকে সৃষ্টি করেছেন তার স্ত্রীকে এবং তাদের থেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন বহু পুরুষ ও নারী। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যার মাধ্যমে তোমরা একে অপরের কাছে চেয়ে থাক। আর ভয় কর রক্ত-সম্পর্কিত আত্মীয়ের ব্যাপারে। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর পর্যবেক্ষক।” এছাড়াও সূরা আল আ’রাফের ১৮৯ নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছে, “তিনিই সে সত্তা যিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এক ব্যক্তি থেকে এবং তার থেকে বানিয়েছেন তার সঙ্গিনীকে, যাতে সে তার নিকট প্রশান্তি লাভ করে। অতঃপর যখন সে তার সঙ্গিনীর সাথে মিলিত হল, তখন সে হালকা গর্ভ ধারণ করল এবং তা নিয়ে চলাফেরা করতে থাকল। অতঃপর যখন সে ভারী হল, তখন উভয়ে তাদের রব আল্লাহকে ডাকল, ‘যদি আপনি আমাদেরকে সুসন্তান দান করেন তবে অবশ্যই আমরা কৃতজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হব’।” অন্যত্র সূরা আয-যুমারের আয়াত নং ৬-এ বলা হয়েছে, “ তিনি তোমাদেরকে একই ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তার থেকে তিনি তার জুড়ি সৃষ্টি করেছেন। তিনি তোমাদের জন্য বানিয়েছেন আট গৃহপালিত পশু (চার) জোড়ায় জোড়ায়। তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের মায়েদের গর্ভে, এক এক পর্যায়ে এক এক আকৃতি দিয়ে, তিন তিনটি অন্ধকার আবরণের মধ্যে। এই হল তোমাদের প্রতিপালক, সর্বময় কর্তৃত্ব তাঁরই, তিনি ছাড়া সত্যিকারের কোন ইলাহ নেই, কাজেই (ভুয়ো ক্ষমতার অধিকারী, দাম্ভিক ও স্বার্থান্বেষী মহল কর্তৃক) তোমাদেরকে কোন্ দিকে ফিরিয়ে নেয়া হচ্ছে?” এসব কথাই তখনকার সমাজ ব্যবস্থার কাছে ছিল এক বিপ্লব। যে সময়ে ইউরোপের অনেক দেশে নারীর আইনগত অস্তিত্বই ছিল না, সে সময়ে ইসলামী আইন নারীর আলাদা সম্পত্তি অধিকার, উপার্জনের অধিকার, বিবাহে সম্মতি ও উত্তরাধিকার নির্ধারণ করে দিয়েছে। সূরা আন-নিসা’র ১১ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে আদেশ করেন, একজন পুরুষের অংশ দু’জন নারীর অংশের সমান। অতঃপর যদি শুধু নারীই হয় দুই-এর অধিক, তবে তাদের জন্য ওই মালের তিন ভাগের দুই ভাগ যা ত্যাগ করে মরে এবং যদি একজনই হয়, তবে তার জন্যে অর্ধেক। মৃতের বাবা-মার মধ্য থেকে প্রত্যেকের জন্যে রেখে যাওয়া সম্পত্তির ছয় ভাগের এক ভাগ, যদি মৃতের ছেলে থাকে। যদি ছেলে না থাকে এবং বাবা-মা ওয়ারিস হয়, তবে মা পাবে তিন ভাগের এক ভাগ। অতঃপর যদি মৃতের কয়েকজন ভাই থাকে, তবে তার মাতা পাবে ছয় ভাগের এক ভাগ। ওসিয়ত পূরণ করার পর; যা (ওসিয়ত) করে মরেছে কিংবা ঋণ পরিশোধের পর। তোমাদের বাবা ও ছেলের মধ্যে কে তোমাদের জন্যে অধিক উপকারী তোমরা জান না। এটা আল্লাহ কতৃক নির্ধারিত অংশ। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।” ইসলামী সভ্যতার প্রথম যুগেই এমন অসংখ্য নারী ছিলেন যারা হাদিস শিক্ষা দিতেন, ক্ষেত্রবিশেষে বিচারক হিসেবেও কাজ করতেন, আবার কেউ কেউ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত করেছেন—যেমন ফাতিমা মুহাম্মদ আল-ফিহরি, যিনি বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি প্রতিষ্ঠা করেন।
ধর্মীয় উৎসে নারীর মর্যাদা কোনও গৌণ বিষয় নয়। কুরআনে আল্লাহ ন্যায়ের উপর সমাজ গড়তে বলেছেন। দাম্পত্য সম্পর্ককে তুলনা করা হয়েছে আবরণ বা বস্ত্রের সঙ্গে—যা পরস্পরকে ঢেকে রাখে, সহায়তা করে ও মর্যাদা দেয়। সূরা আন-নিসা’র আয়াত ১৯-এ বলা হয়েছে, “ নারীদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবন-যাপন কর।” নবী মুহাম্মদ (সাঃ) স্পষ্ট বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে তার স্ত্রীর সঙ্গে উত্তম আচরণ করে, আর আমি তোমাদের মধ্যে আমার স্ত্রীদের সঙ্গে সবচেয়ে উত্তম আচরণ করি।”(সুনান আত তিরমিজী) আরও বলেছেন, “ ইলম তলব করা বা জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের (নর নারী) জন্য ফরয।”(ইবনু মাজাহ্, কিতাবুল ইলম, হাদীস নং ২২৪) ইসলাম মেয়েদের প্রতি অবহেলা নিষেধ করে। কন্যা-সন্তানকে লালন-পালন করা জান্নাতের কারণ বলা হয়েছে। অর্থাৎ ইসলামের মূল নীতি কোনওভাবেই নারীর অবমূল্যায়ন বা দমনকে সমর্থন করে না। তবে এখানেই আসে মানবসমাজ ও সংস্কৃতির জটিলতা। সব ধর্মীয় ব্যবস্থা যেমন মানুষের ব্যাখ্যা, সমাজের চর্চা ও রাজনীতির মাধ্যমে পরিবর্তিত হয় ইসলামের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই ঘটেছে। ইসলাম নারীর জন্য যে সম্মান, নিরাপত্তা ও অধিকার নির্ধারণ করেছে বিভিন্ন যুগ ও অঞ্চলের মুসলিম সমাজ সেটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে।পুরুষ-প্রাধান্য, পারিবারিক অভ্যাস, উপজাতীয় সংস্কৃতি এবং স্থানীয় প্রথা ইসলামি নীতিকে ঢেকে ফেলেছে। ফলশ্রুতিতে বিভিন্ন দেশে নারীরা চাকরি গ্রহণে প্রতিবন্ধকতা, সম্পত্তির পূর্ণ অধিকার থেকে বঞ্চনা এবং বিবাহ ও শিক্ষার বিষয়ে সীমিত স্বাধীনতার মুখোমুখি হয়।এই পরিস্থিতি ইসলামী আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়; এটি মূলত মানুষের তৈরি অব্যবস্থা।
ইসলাম নারীকে শিক্ষা, কাজ, উপার্জন ও সম্পত্তির উপর পূর্ণ অধিকার দিয়েছে। একজন নারী নিজের রুজি অর্জন করলে তার আয়ের মালিকানা অন্য কারও নয়; স্বামীরও নয়। ধর্মীয়ভাবে কোথাও বলা হয়নি যে নারী ঘরের বাইরে যেতে পারবে না বা সামাজিক কর্মকা-ে অংশ নিতে পারবে না। ইতিহাসের কিছু ব্যাখ্যা, বিশেষ মতবাদ, পুরনো আইন ও সামাজিক চাপ নারীর এই স্বাধীনতাকে সংকুচিত করেছে। এসব ব্যাখ্যার ভেতর অনেক সময় যুগের বাস্তবতা কাজ করেছে—তখনকার সমাজে নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামো আজকের মতো ছিল না। আজকের বিশ্বে সেই ব্যাখ্যা অপরিবর্তিতভাবে বসিয়ে দিলে তা ইসলামের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না বরং এক ধরনের জড়তা সৃষ্টি করবে।
নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি জায়গা। ইসলাম নারীদের সম্পত্তির অধিকার দিয়েছে—যা পৃথিবীর অনেক দেশে বহু শতাব্দী পর আইনি স্বীকৃতি পায়। কুরআন স্পষ্টভাবে নারীর অংশ নির্ধারণ করে দেয়, বাস্তবে পরিবারের অভ্যাস ও সামাজিক চাপের কারণে অনেক নারীর সেই অধিকার কাগজেই থেকে যায়। আবার অনেক দেশে নারীরা রাজনৈতিকভাবে সক্রিয়, ভোট দেয়, সংসদে যায় ও মন্ত্রীত্ব পায়—তবুও কিছু জায়গায় নারীর রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক দেখা যায়। এর পেছনের মূল সমস্যা ধর্মীয় শিক্ষার ঘাটতি নয়—বরং এমন ব্যাখ্যা যা সময়, সমাজ ও প্রেক্ষাপট বুঝে নতুনভাবে চিন্তা করতে ব্যর্থ হয়।
এছাড়া শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে মুসলিম নারীদের অবদান ইতিহাস ও বর্তমান—দুটিতেই উজ্জ্বল। আজকাল সবাই মনে করে—”ঝঞঊগ”-এ (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত) নারীরা যত বেশি এগোবে সমাজ তত উন্নত হবে। এই ধারায় বহু মুসলিম নারী আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিজ্ঞানী, চিকিৎসক ও প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করছেন। ইসলামের মূল ধারণা—জ্ঞান, দায়িত্ব ও ন্যায়—এই তিনটি নীতি নারীর সামাজিক অংশগ্রহণকে আরও শক্তিশালী করে। জ্ঞান যদি ফরজ হয় তাহলে নারীর ঘরবন্দিত্ব ধর্মীয়ভাবে কখনওই ন্যায়সঙ্গত হতে পারে না।
তবে ইসলাম ও নারী স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলতে গেলে যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো—ধর্মের নীতি এবং সমাজের আচরণ এক নয়। ইসলাম যে অধিকার দিয়েছে, সমাজ তা মেনে নাও চলতে পারে; সমাজ যে আচরণ করে তা ইসলামি আদর্শ হতে নাও পারে। ফলে ইসলামকে দোষারোপ করা সহজ হলেও এর ভেতরে প্রথাগত সংস্কৃতি, অশিক্ষা, দারিদ্র্য, রাজনৈতিক অপব্যবহার এবং পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর ভূমিকা আরও বড়। ইসলামে নারীকে অপমান করার জায়গা নেই, কিন্তু মানবসমাজের প্রথায় এমন অপব্যবহার বহু জায়গায় রয়েছে—সেটি ধর্মের ভুল নয়, সমাজের ভুল।
একই সঙ্গে আজকের পৃথিবীতে নারীর স্বাধীনতা নিয়ে যে পশ্চিমা ধারণা আছে তা সব সমাজে একইভাবে মানানসই নাও হতে পারে। ইসলামের স্বাধীনতা দায়িত্বের সঙ্গে বাঁধা—যেখানে ব্যক্তির নৈতিকতা, পরিবার ও সমাজ মিলিয়ে একটি সমন্বিত জীবনধারা তৈরি হয়। এই সমন্বয় কখনও পশ্চিমা মডেলের একক স্বাধীনতার সঙ্গে একমত নাও হতে পারে। কিন্তু এর মানে নয় যে ইসলাম নারীর স্বাধীনতার বিরুদ্ধে। বরং ইসলাম চেয়েছে মর্যাদাশীল, নিরাপদ ও দায়িত্বশীল স্বাধীনতা—যেখানে নারী নিজের ইচ্ছায় শিক্ষা, কাজ, সম্পত্তি, পরিবার ও জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং তা করার পেছনে ধর্মীয় সমর্থন থাকে।
সুতরাং সারকথা হলো—ইসলামে নারী-স্বাধীনতার মূল ভিত্তি অত্যন্ত শক্তিশালী। ধর্মীয়ভাবে নারীকে মানুষ হিসেবে পূর্ণ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, তাদের অধিকার লেখা আছে কুরআনে, নবী মুহাম্মদ (সাঃ) তা বাস্তবে প্রয়োগ করেছেন। ধর্ম সমস্যা সৃষ্টি করেনি; সমস্যা সৃষ্টি করেছে ভুল ব্যাখ্যা, সামাজিক রীতি ও পুরুষতন্ত্র। ইসলাম নারী স্বাধীনতাকে দমন করার জন্য আসেনি; বরং তাদের সুরক্ষা, মর্যাদা এবং ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে এসেছে।যে সমাজ ইসলামের মূল নীতি ঠিকভাবে বোঝে সেই সমাজে নারী উন্নতি ও মর্যাদা পায়। আর যে সমাজ এই নীতি ভুলে যায় সেই সমাজেই নারী ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। তাই আজকের আলোচনায় সবচেয়ে জরুরি হলো—ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা পুনরায় বোঝা, ভুল ব্যাখ্যা ছেঁটে ফেলা ও একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা যেখানে নারী স্বাধীনতার মানে হবে—মানবিক মর্যাদা, জ্ঞান, নিরাপত্তা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ও সম্মান।
লেখক: আসাম , ভারত, পেশা: শিক্ষকতা